শীতজনিত রোগের প্রকোপ, শিশু হাসপাতালে চাপ

বৃহস্পতিবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

শীতজনিত রোগের প্রকোপ, শিশু হাসপাতালে চাপ

তীব্র শীতে দেশের সব হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ৪০০ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। এর মধ্যে ৭০ শতাংশই ডায়রিয়ায় আক্রান্ত। বাকি ৩০ শতাংশ রোগী শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণজনিত সমস্যা সর্দি-কাশি, ইনফ্লুয়েঞ্জা, গলাব্যথা, টনসিলাইটিস, সাইনোসাইটিস, ল্যারিঞ্জাইটিসে ভুগছেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখার তথ্য অনুযায়ী, ১ নভেম্বর থেকে গত শনিবার পর্যন্ত সারাদেশে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয়ে ৭৯ হাজার ৪২৯ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। এর মধ্যে ৩১ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভর্তি রোগীর মধ্যে ৫৫ হাজার ৬৮৩ জন ডায়রিয়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন ২৩ হাজার ৭৪৬ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, সিলেট ও চাঁদপুর– এই ছয় জেলায় ঠান্ডাজনিত রোগের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি। শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণে সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছে নরসিংদীতে, চার হাজার ১৩৯ জন। এরপর চট্টগ্রামে এক হাজার ২৯৩ জন, কক্সবাজারে এক হাজার ১৩৯ জন, সিলেটে এক হাজার ১৩৪ জন এবং চাঁদপুরে ৭৫৭ জন।

ডায়রিয়ার প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সেখানে এ রোগে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন চার হাজার ৬৫৭ জন। এরপর চট্টগ্রামে তিন হাজার ৮৬০ জন, কক্সবাজারে তিন হাজার ২৮২ জন, নরসিংদীতে দুই হাজার ৩৩৯ জন এবং সিলেটে দুই হাজার ২০৪ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।

শিশুদের ঝুঁকি বেশি
চিকিৎসকরা বলছেন, প্রাপ্তবয়স্কদের চেয়ে শিশুরাই শীতকালীন রোগে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে। হঠাৎ তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নিতে না পারায় তাদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ছে। জ্বর, সর্দি, কাশি, শ্বাসকষ্ট ও অ্যালার্জিজনিত জটিলতা শিশুদের মধ্যে বেশি দেখা যাচ্ছে।

শিশু হাসপাতালে শয্যা সংকট
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে গিয়ে দেখা গেছে, ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত শিশুর ভিড়ে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। এক বছরের মেয়ে সুমাইয়াকে নিয়ে কেরানীগঞ্জ থেকে হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসেছেন মা আকলিমা আক্তার। তিনি বলেন, এক সপ্তাহ ধরে মেয়ের ঠান্ডা লেগেছে। ওষুধেও সারেনি, তাই এখানে নিয়ে এসেছি।

জ্বর, কাশি ও ডায়রিয়ায় আক্রান্ত দেড় বছরের ইয়াসিনকে চিকিৎসক ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলেও শয্যা না থাকায় বিপাকে পড়েছেন তার স্বজন। হাসপাতালের বহির্বিভাগে এক ঘণ্টায় অন্তত ২০ শিশুর অভিভাবককে শয্যা না পেয়ে ফিরে যেতে দেখা যায়।

নিউমোনিয়া ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে একটি শয্যাও খালি নেই। চিকিৎসক জানান, প্রাথমিক চিকিৎসার পর অনেক শিশুকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়, অবস্থার অবনতি হলে ভর্তি করার পরামর্শ দেওয়া হয়।

চিকিৎসকদের সতর্কবার্তা
হাসপাতালের বহির্বিভাগে দায়িত্বরত চিকিৎসক মাহফুফ হাসান আল মামুন বলেন, ৯০ শতাংশ শিশু জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়া নিয়ে আসছে। গুরুতর রোগীর বেশির ভাগই এক বছরের কম বয়সী। রেজিস্ট্রার ডা. সুমাইয়া লিজা বলেন, প্রায় ২০ শতাংশ রোগীর ভর্তির প্রয়োজন হচ্ছে। তবে শয্যা না থাকায় অনেককেই অন্যত্র স্থান্তান্তর করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের শিশু শ্বাসতন্ত্র বিভাগের অধ্যাপক ডা. প্রবীর কুমার সরকার বলেন, শীতকালে ফ্লু, সর্দি, কাশি ও নিউমোনিয়ার প্রকোপ বেড়ে যায়। এ সময় অভিভাবকদের সতর্ক থাকতে হবে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা যাবে না। শীতকালের বেশির ভাগ রোগই ভাইরাসজনিত। শিশুর জ্বর, কাশি বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি।

বয়স্কদেরও সতর্কতা প্রয়োজন
মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ইমেরিটাস অধ্যাপক ডা. এ বি এম আবদুল্লাহ বলেন, শীত মৌসুমে শিশু ও বয়স্কদের বাড়তি যত্ন নেওয়া জরুরি। ব্রঙ্কাইটিস, নিউমোনিয়া, শ্বাসজনিত ও বাতজনিত রোগের প্রকোপ এ সময় বেড়ে যায়। তিনি বলেন, প্রয়োজন ছাড়া শিশু-বয়স্কদের বাইরে না বের হওয়াই ভালো। বাইরে গেলে অবশ্যই গরম কাপড় পরতে হবে এবং কান, নাক ও মুখ ঢেকে রাখতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত ওষুধ সেবন, হালকা গরম খাবার খাওয়া এবং সুযোগ পেলে রোদে বসার পরামর্শ দেন তিনি।

এই বিভাগের আরো খবর