রাজশাহীর বাগমারা উপজেলা- একটি ঐতিহ্যবাহী অঞ্চল। ১৬টি ইউনিয়ন ও দুইটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই উপজেলা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে বাগমারায় নেই কোনো জনপ্রতিনিধি। ফলে সমস্ত কার্যক্রম চলছে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) কেন্দ্রিক। আর এই সুযোগে বিভিন্ন দপ্তর এক ধরনের ‘অভিভাবকহীন রাম রাজত্ব’ চালু করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার খাদ্য অফিসের ইতিহাসে সম্প্রতি ঘটেছে এক চরম দুর্নীতি। প্রায় সাত কোটি টাকা শস্য ক্রয়ের তছরুপের ঘটনায় শুধু ভবানীগঞ্জ খাদ্য গুদামের উপ-পরিদর্শক বাচ্চু মিয়াই শাস্তি পেয়েছেন।
স্থানীয়রা বলছেন, “একজন ব্যক্তি এ ধরনের দুর্নীতি একার পক্ষে সম্ভব নয়; দায়িত্বশীলদের এড়িয়ে যাওয়া যায় না।” প্রকৃতপক্ষে, মাত্র ১০-২০ শতাংশ পার্থক্য দেখিয়ে একটি ‘হতভাগ্য’ কর্মীকে বলির পাঠা বানানো হয়েছে বলে অভিযোগ।
একটি সরকারি পুকুরের কচুরিপানা পরিস্কার করতেও লক্ষাধিক টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যেখানে প্রত্যক্ষদর্শীরা মনে করেন এটি করা যেত মাত্র ১০ হাজার টাকায়। এমন অভিযোগ সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করলেই ম্যাসেজ ডিলিট করতে বাধ্য করা হয়েছে।
গত ১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা একই ধরনের পাঞ্জাবি পরে উপস্থিত হন। এই বিষয়টি স্থানীয়দের মনে প্রশ্ন জাগিয়েছে- “এর অর্থ কী এবং খরচের উৎস কোথা থেকে?” এ নিয়ে একজন ছাত্রের পোস্টকে কেন্দ্র করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে নানাভাবে নিপীড়ন করার অভিযোগও রয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরে উপজেলায় বরাদ্দ ছিল প্রায় ২ কোটি ৭৪ লক্ষ টাকা, যা ছিল জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জন্য। তবে প্রশাসন বরাদ্দের বিপরীতে ১০-২০ শতাংশ ‘নজরানা’ দাবী করেছে। বিশেষ করে যেখানে ইউনিয়নের চেয়ারম্যানরা সাময়িক বরখাস্ত ছিলেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ও মেম্বারদের মাধ্যমে প্রশাসন প্রকল্পের বিল দ্রুত পরিশোধ করিয়েছে। বিএনপি সমর্থিত চেয়ারম্যানদের প্রতিবাদ সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশের কারণে প্রশাসন নানা গড়িমসি করেছে। বিশেষ করে বিহানালী ও আউচপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যানদের প্রকল্প বিল পাস করতে নানা বাধ্যবাধকতা আরোপ করা হয়েছে।
তাহেরপুর পৌরসভায় ইউএনও দায়িত্ব নেওয়ার পর খাস জমিজমা কলেজের নামে লিজ বাতিল করেন। এতে শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীসহ স্থানীয়রা মানববন্ধন করেন। ভবানীগঞ্জ পৌরসভায় প্রশাসকের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনারও নানা সিদ্ধান্ত নেন।
উপজেলা প্রশাসন গ্রাম পুলিশ নিয়োগে তুঘলকি সিদ্ধান্ত নেয়। চেয়ারম্যান মাহমুদুর রহমান মিলন অভিযোগ করেছেন, প্রশাসন আওয়ামী লীগপন্থী ব্যক্তিদের বোর্ডে বসিয়ে ইউনিয়ন পর্যায়ে টাকা কালেকশন চালাচ্ছে। ভিতরে অফিসের দায়িত্বশীলরা ভালোভাবে কাজ করলেও বাইরে কালেকশন এজেন্টরা নিরীহ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা সংগ্রহ করছে।
মিলনের বক্তব্য, “আমরা যারা ভালো চেয়ারম্যান-মেম্বার আছি, আমাদের প্রকল্পের বিল সঠিক সময়ে দেয়া হয় না। চার-পাঁচবার পরিদর্শন করা হয়, কাজের মানও জানানো হয় না। সমাজসেবা থেকে ভাতাভোগীর টাকা রাতারাতি গায়েব হয়ে যায়, প্রকৃত কৃষকরা সার পান না।”
আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী কর্মকর্তা নিয়োগে একপক্ষীয় প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পিজাইডিং অফিসার, সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার ও পুলিং অফিসার হিসেবে আওয়ামী লীগপন্থী শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ করা হয়েছে। তবে এ নিয়ে ইউএনও মাহবুবুল ইসলাম জানান, এটি বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টের ভিত্তিতে করা হয়েছে।
অফিসে অন্যান্য অভিযোগের জবাবে তিনি বলেছেন, সার কেলেঙ্কারি ও পচা খাদ্য ক্রয় বিষয়ে মামলা হয়েছে। অন্যান্য প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছেন, “সামনাসামনি এসে কথা বললে সব পরিষ্কার হবে।”