দেশের বিভিন্ন স্থানে টানা সহিংসতায় গত ১৫ দিনে অর্ধশত জন খুন হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে আটজন নারী। ছুরিকাঘাত, গুলিবর্ষণ, গণপিটুনি, শ্বাসরোধ, কুপিয়ে হত্যা ও সংঘর্ষ- বিভিন্ন ঘটনায় এসব প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। খুলনা ও চট্টগ্রাম বিভাগে হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা বেশি, তুলনামূলক কম বরিশাল ও রংপুরে।
সর্বশেষ ২৬ ফেব্রুয়ারি নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য আমির হোসেনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে হত্যার পর লাশ নদীতে ফেলে দেয় দুর্বৃত্তরা। তিনি নৌকায় করে পৈতৃক বাড়ি চরমধুয়ায় যাচ্ছিলেন। একই দিনে চট্টগ্রাম, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, খুলনা মহানগর ও নরসিংদীতে পৃথক ঘটনায় আরও পাঁচজন নিহত হন। নরসিংদীর মাধবদীর দাড়িকান্দি গ্রামে আমেনা আক্তার নামে এক কিশোরীর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পরিবারের অভিযোগ, সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর তাকে হত্যা করা হয়েছে।
পুলিশের অপরাধ তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিহতদের মধ্যে বিএনপির তিন কর্মী, যুবদলের এক নেতা, ছাত্রদলের এক কর্মী ও জামায়াতের এক সমর্থক রয়েছেন। ছুরিকাঘাতে নিহত হয়েছেন আটজন, গুলিতে তিনজন। অজ্ঞাত দুর্বৃত্তদের হাতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত সাতজন।
খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ ১১ খুন
১৮ ফেব্রুয়ারি থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত খুলনা বিভাগে ১১ জন নিহত হয়েছেন। আধিপত্য বিস্তার, পূর্বশত্রুতা, রাজনৈতিক বিরোধ ও অজ্ঞাত কারণ- বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে এসব ঘটনা ঘটে।
২৭ ফেব্রুয়ারি খুলনার দিঘলিয়া উপজেলায় যুবদল নেতা মো. মুরাদ খাঁকে কুপিয়ে ও পায়ের রগ কেটে হত্যা করা হয়। তিনি সেনহাটি ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ছিলেন। এ ঘটনায় ছাত্রদলের বহিষ্কৃত নেতা সাজ্জাদ হোসেনসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। স্থানীয় সূত্র জানায়, হাটের ইজারা নিয়ে বিরোধের জের ধরে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।
এ ছাড়া ২৬ ফেব্রুয়ারি নগরের খানজাহান আলী থানার আফিলগেট এলাকায় মোটরসাইকেল গ্যারেজে ঢুকে ব্যবসায়ী শেখ সোহেলকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তিনি মাছের ঘের ও ইন্টারনেট ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
চট্টগ্রামে ৮ হত্যাকাণ্ড
দুই সপ্তাহে চট্টগ্রামে আটজন নিহত হয়েছেন। জমিজমা বিরোধ, অনলাইন জুয়া, পূর্বশত্রুতা, ডাকাতি ও পারিবারিক বিরোধসহ নানা কারণে এসব ঘটনা ঘটে। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাউজানে যুবদলকর্মী মুহাম্মদ আবদুল মজিদকে বাজার থেকে ফেরার পথে মুখোশধারীরা গুলি করে হত্যা করে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে রাউজানে ২১টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি, যার মধ্যে ১৫টি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট।
ঢাকা বিভাগে ৯ জন নিহত
ঢাকা বিভাগ ও মহানগরে গত ১৮ ফেব্রুয়ারির পর অন্তত নয়জন নিহত হয়েছেন। প্রেমঘটিত বিরোধ, সন্ত্রাসী হামলা, মাদক কারবার, জমিজমা বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার ও অজ্ঞাত কারণে এসব ঘটনা ঘটে।
রাজধানীর হাজারীবাগে প্রেমের বিরোধের জেরে অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী শাহরিয়ার শারমিনকে হত্যার ঘটনায় আসামি সিয়াম হোসেন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তদন্তে জানা গেছে, সম্পর্কের টানাপোড়েন থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।
এ ছাড়া হাতিরঝিলে ছয় বছরের শিশু তাহেদী আক্তারের মরদেহ উদ্ধার, এবং ওবায়দুল্লাহ নামে এক যুবককে হত্যার পর দেহ খণ্ডিত করে বিভিন্ন এলাকা থেকে অংশ উদ্ধারের ঘটনাও চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে।
রাজশাহী, রংপুর ও বরিশাল
রাজশাহী বিভাগে সাতজন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সংঘর্ষ, ওয়াজ মাহফিলকে কেন্দ্র করে বিরোধ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের জের এবং ডাকাত সন্দেহে এসব ঘটনা ঘটে।
রংপুরে চারজন নিহত হয়েছেন। ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, গণপিটুনি ও অজ্ঞাত কারণে এসব মৃত্যু হয়। বরিশাল বিভাগে দুজন নিহত হয়েছেন। পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় ফেসবুক পোস্ট ঘিরে বিরোধের জেরে ইদ্রিস খান নামে এক ব্যক্তি নিহত হন।
ক্রমবর্ধমান হত্যাকাণ্ডে জনমনে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বলছে, অধিকাংশ ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।