‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও জামায়াতের চাপে ভোটের সমীকরণ জটিল

বৃহস্পতিবার, ১৯শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ৬ই ফাল্গুন, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী ও জামায়াতের চাপে ভোটের সমীকরণ জটিল

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-কে কেন্দ্র করে সিরাজগঞ্জের নির্বাচনী রাজনীতিতে বইছে নতুন হাওয়া। জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে ইতোমধ্যে মনোনয়ন যুদ্ধে নেমেছেন ৪৪ জন প্রার্থী। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত জেলা নির্বাচন অফিস থেকে এসব মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়েছে। এবারের নির্বাচনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপির উত্থান এবং জামায়াতের শক্ত অবস্থান।

সিরাজগঞ্জের নির্বাচনী মাঠ পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, তিনটি আসনে বিএনপির প্রার্থীরা নিজ দলের বিদ্রোহীদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। একটি আসনে বিএনপির প্রার্থীর বিপরীতে স্বতন্ত্র হিসেবে দাঁড়িয়েছেন তাঁতী দলের কেন্দ্রীয় নেতা। সবচেয়ে চমকপ্রদ ঘটনা ঘটেছে সিরাজগঞ্জ-৫ আসনে, যেখানে দলীয় মনোনয়ন না পেয়ে সাবেক এক বিএনপি সংসদ সদস্য এনসিপির ব্যানারে মাঠে নেমেছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিদ্রোহ ও দলবদল জেলার নির্বাচনী সমীকরণকে অনিশ্চিত ও জটিল করে তুলেছে।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির অনেক বিদ্রোহী প্রার্থী আশা করছেন, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দেশে ফেরায় মনোনয়ন তালিকা মূল্যায়ন বা পরিবর্তন হতে পারে। এই প্রত্যাশাতেই তারা শেষ সময় পর্যন্ত মাঠে টিকে থাকার চেষ্টা করছেন।

সিরাজগঞ্জ-১ (কাজীপুর ও সদর আংশিক) আসনে বিএনপির সেলিম রেজার বিপরীতে জামায়াতের জেলা আমির মাওলানা শাহীনুর আলম এবং নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্নার মতো হেভিওয়েটরা মনোনয়ন তুলেছেন। এ ছাড়া গণঅধিকার পরিষদের মল্লিকা খাতুন, স্বতন্ত্র আব্দুস সবুর, নাগরিক ঐক্যের নাজমুস সাকিব মনোনয়ন তুলেছেন। কণ্ঠশিল্পী কনকচাঁপা দলীয় মনোনয়ন না পেলেও আলোচনায় রয়েছেন। সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতির নানা ফুলঝুরি ফোটাচ্ছেন।

বিএনপি প্রার্থী সেলিম রেজা কাজীপুরের সার্বিক উন্নয়ন ও নদীভাঙন রোধে কাজ করবেন বলে জানান। মাওলানা শাহীনুর আলম ইনসাফভিত্তিক শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দেন।

সিরাজগঞ্জ-২ (সদর ও কামারখন্দ) আসনে বিএনপির শক্ত প্রার্থী স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। তবে তাঁকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত জামায়াতের জাহিদুল ইসলাম ও সিপিবির আনোয়ার হোসেন। টুকু জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী হলেও জামায়াত প্রার্থীর দাবি, মানুষ এবার চাঁদাবাজির রাজনীতি বর্জন করবে। এ আসনে ইসলামী আন্দোলনের মুফতি মুহিবুল্লাহ, বাসদের এস.এম. আবদুল্লাহ আল মামুন মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।

সিরাজগঞ্জ-৩ (রায়গঞ্জ-তাড়াশ) আসনে বিএনপির ভিপি আয়নুল হকের বিপরীতে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন সাবেক উপজেলা সভাপতি খন্দকার সেলিম জাহাঙ্গীর। তৃণমূলের একটি অংশ প্রয়াত এমপি আব্দুল মান্নান তালুকদারের ছেলের পক্ষে আন্দোলন করছে, যা বিএনপিকে অস্বস্তিতে ফেলেছে।\

সেলিম জাহাঙ্গীর বলেন, ‘দুঃসময়ে জেল খেটেছি কিন্তু ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়ন পাইনি।

ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান এসেছেন। আশা করছি, তিনি তৃণমূলের নেতাদের মূল্যায়ন করবেন।’ এখানে জামায়াতের ড. মাওলানা আব্দুস সামাদও শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে বিজয় শতভাগ জামায়াতের।

সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া) আসনে সাবেক এমপি এম. আকবর আলীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছেন উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব হবে আজাদ হোসেন। আজাদ হোসেনের দাবি, অযোগ্য প্রার্থী দেওয়ায় আসনটি জামায়াতের হাতে চলে যেতে পারে। এম. আকবর আলীর ভাষ্য, চাঁদাবাজি ও অনৈতিক কর্মকাণ্ড না করায় দুবার এমপি হয়েছেন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়েছেন। নির্বাচিত হলে নার্সিং ইনস্টিটিউট ও মাস্টার্স কোর্স চালুর চেষ্টা করবেন।

সিরাজগঞ্জ-৫ (বেলকুচি-চৌহালী) আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা আমিরুল ইসলাম খান আলীমের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী গোলাম মওলা খান বাবলু। অন্যদিকে সাবেক এমপি মেজর (অব.) মঞ্জুর কাদের এনসিপির প্রার্থী হওয়ায় এখানে ভোটের হিসাব পাল্টে গেছে।

সিরাজগঞ্জ-৬ (শাহজাদপুর) আসনে ড. এম.এ. মুহিতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন জেলা বিএনপির উপদেষ্টা শফিকুল ইসলাম ও স্বেচ্ছাসেবক দলের গোলাম সরোয়ার। এখানে জামায়াতের মাওলানা মিজানুর রহমানসহ ১০ জনেরও বেশি প্রার্থী মনোনয়ন তুলেছেন।

মাঠে বিএনপি ও জামায়াতের সরব উপস্থিতি থাকলেও এনসিপি, গণসংহতি পার্টি বা এবি পার্টির মতো দলগুলো এখনও অনেকটা নীরব। সাধারণ ভোটারদের ধারণা, সিরাজগঞ্জের পাঁচটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে সরাসরি এবং হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে।

নির্বাচনী তপশিল অনুযায়ী ২৯ ডিসেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব বিদ্রোহীদের মানিয়ে নিতে পারে কিনা, তার ওপরই নির্ভর করছে সিরাজগঞ্জের নির্বাচনী ফল।

এই বিভাগের আরো খবর