বৃহস্পতিবার, ৮ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ২৪শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

কনকনে শীতে এক কম্বলে রাত কাটে তিন শিশুর

শীত আসার আগে প্রতিবছরই সরকারি দপ্তরগুলোতে শীতবস্ত্র বিতরণের তালিকা হয়, সভা হয়, আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই তালিকার বাইরে থেকে যায় অনেক পরিবার। হাড় কাপানো শীত আর ঘন কুয়াশায় যখন স্বাভাবিক জীবন থমকে গেছে, তখন ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নের সিন্দুর্না নদীপাড়ার একটি জরাজীর্ণ টিনের ছোট্ট ঘরে চলছে এক মায়ের অসহায় লড়াই।

তিন সন্তান নিয়ে জরাজীর্ণ ঘরে থাকেন বিলকিস। স্বামী বেঁচে থাকলেও শারীরিকভাবে অক্ষম হওয়ায় পরিবারের ভরণপোষণে সম্পূর্ণ অক্ষম। ফলে সংসারের পুরো দায়িত্ব একা মায়ের কাধে। যদিও এই পরিবারের দুই সন্তান শারীরিকভাবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় আইন অনুযায়ী বিশেষ সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে তাদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, ঘরের মেঝেতে সামান্য খড় বিছানো। তার ওপর গা ঘেষে শুয়ে থাকে তিন শিশু। শীত ঠেকাতে আছে মাত্র একটি ছেড়া কম্বল। টিনের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া হিমেল বাতাসে রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাঁপতে থাকে শিশুদের শরীর। বারবার কাশি, জ্বর অথচ চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই।

এই অবস্থায় বিলকিস আক্তার রাত পার করেন বসে বসে। কারণ কম্বলটি সন্তানদের গায়ে চাপিয়ে দিলে নিজের গায়ে দেওয়ার কিছু থাকে না। রাতভর সন্তানের শ্বাস-প্রশ্বাস আর কাঁপুনি গুনে গুনে ভোরের অপেক্ষা করেন তিনি।

বিলকিস আক্তার বলেন, দুইটা বাচ্চা প্রতিবন্ধী। ঠান্ডা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। রাতে কাঁপতে কাঁপতে থাকে। তখন আমি শুধু পাশে বসে থাকি। চোখের পানি ফেলি। ঘরে খাবারও থাকে না। সাদা ভাত খাইয়ে দিন পার করি। সাহায্য না পেলে বাঁচব না।

প্রতিবেশী রেজাউল ইসলাম বলেন, এই পরিবারটা বছরের পর বছর কষ্ট করছে। বিষয়টি স্থানীয়ভাবে জানানো হয়েছে। কিন্তু বাস্তব সহায়তা আসেনি। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে এসব সহায়তা যাচ্ছে কার কাছে?

একই গ্রামের বাসিন্দা মো. নুর আলম বলেন, শীতে কাপড় বিতরণ হয় আমরা দেখি। কিন্তু এমন পরিবার বাদ পড়ে যায় কীভাবে? এটা অবহেলা নয়, এটা ব্যর্থতা।

রাশিদা বেগম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, একজন মা সারারাত বসে থাকে। এটা যদি প্রশাসনের চোখে না পড়ে, তাহলে আর কী দেখবে?

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ঠাকুরগাঁও জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল লতিফ বলেন, দুইজন প্রতিবন্ধী সন্তানসহ অসহায় পরিবারের এভাবে শীতে কষ্ট পাওয়ার অর্থ হলো প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় গুরুতর ঘাটতি রয়েছে। সরকার প্রতিবছর শীতবস্ত্র, প্রতিবন্ধী ভাতা ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ দেয়। কিন্তু যদি প্রকৃত ভুক্তভোগীরা তা না পায়, তাহলে সেই কর্মসূচির স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে। এ ধরনের পরিবার চিহ্নিত করা প্রশাসনের দায়িত্ব। এখানে দয়া নয় এটা রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা।

ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. খাইরুল ইসলাম বলেন, খবরটি জানার পর বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। ওই পরিবারটি প্রকৃতই অসহায়। দ্রুত তাদের জন্য শীতবস্ত্র ও প্রয়োজনীয় সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। কেন তারা এতদিন সরকারি সহায়তা পায়নি সেটিও খোঁজ নেওয়া হবে। কেউ যেন সরকারি সহায়তা থেকে বাদ না পড়ে সে বিষয়ে প্রশাসন কাজ করছে।

এই বিভাগের আরো খবর