সরিষা ফুলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছি ও চাষীরা

বুধবার, ২৮শে জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, ১৪ই মাঘ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

সরিষা ফুলে মধু সংগ্রহে ব্যস্ত মৌমাছি ও চাষীরা

নবকৃষ্ণ ভট্টাচার্যের কবিতার সেই চিরচেনা পঙক্তি—
“মৌমাছি মৌমাছি কোথাও যাও নাচি নাচি দাড়াও না একবার ভাই…”
গোদাগাড়ীর সরিষা ক্ষেতে এখন যেন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।

রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর, কমলাপুর, চর আষাড়িয়াদহসহ বিভিন্ন চরাঞ্চল ও খাল-বিলজুড়ে হলুদ সরিষা ফুলে ভরে গেছে মাঠ। দিগন্তজোড়া সরিষার আবাদে ছড়িয়ে পড়েছে মৌ মৌ গন্ধ। এসব ফুলের টানে ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি ছুটে আসছে মধু আহরণে।

মৌমাছিদের যেন ফুরসত নেই। ভোঁ ভোঁ শব্দে দল বেঁধে উড়ে তারা ফুল থেকে ফুলে ঘুরে মধু সংগ্রহ করছে। সংগৃহীত মধু জমা হচ্ছে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে স্থাপিত বাক্সবন্দী মৌচাকে। এখান থেকেই আহরণ করা হচ্ছে মানসম্মত ও বিশুদ্ধ মধু।

কৃষি বিভাগ জানায়, সরিষা ক্ষেতে মৌমাছির বিচরণে স্বাভাবিকের তুলনায় ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত ফলন বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৌমাছির মাধ্যমে পরাগায়ন বাড়ায় সরিষার উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ে। এ কারণে কৃষি বিভাগ সরিষা ক্ষেতে মধু খামার গড়ে তুলতে মৌচাষিদের উৎসাহিত করছে।

গোদাগাড়ী উপজেলার বাসুদেবপুর ইউনিয়নের পাহাড়পুর নামাজ গ্রামের মৌচাষি আতাউর রহমান জানান, তিনি ২০০০ সাল থেকে সরিষা ক্ষেতে মধু সংগ্রহ করছেন। শুরুতে ১০টি মৌবাক্স দিয়ে কাজ শুরু করলেও এখন বাক্সের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতিটি বাক্সে প্রায় ৫০-৬০ হাজার মৌমাছি থাকে এবং একটি মাত্র রাণী মৌমাছি ডিম পাড়ে। প্রতিটি বাক্সে ৫ থেকে ১০টি মোমের ফ্রেম থাকে, যেখানে মধু জমা হয়।

তিনি জানান, এখানে ‘এপিস মেলিফেরা’ জাতের মৌমাছি চাষ করা হচ্ছে। মৌমাছিরা ২-৩ কিলোমিটার দূর থেকেও মধু সংগ্রহ করতে পারে। প্রতি ৮-১০ দিন পরপর প্রতিটি বাক্স থেকে দেড় কেজি পর্যন্ত মধু সংগ্রহ করা হচ্ছে। মাঠেই এই মধু বিক্রি হচ্ছে কেজি প্রতি প্রায় ৪০০ টাকা দরে।

সরিষার মৌসুম শেষ হলে মার্চ মাসে লিচুর মুকুল থেকে মধু সংগ্রহের জন্য বাক্সগুলো নাটোর, ঠাকুরগাঁও, দিনাজপুর কিংবা ঈশ্বরদী এলাকায় নিয়ে যাওয়া হবে বলে জানান মৌচাষিরা। তারা বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও নজরদারি বাড়ানো গেলে মধু উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব। এতে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা যেতে পারে।

স্থানীয় কৃষক বালিয়াঘাটা গ্রামের সাইফুল ইসলাম বলেন, “মৌচাষের এই দৃশ্য আমাদের উদ্বুদ্ধ করেছে। ভবিষ্যতে আমরাও এ পদ্ধতিতে মধু সংগ্রহের উদ্যোগ নেব।”

গোদাগাড়ী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মরিয়ম আহমেদ জানান, মৌচাষের মাধ্যমে তিনটি লক্ষ্য অর্জন করা হচ্ছে—মধু উৎপাদন, সরিষার ফলন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় কৃষকদের মৌচাষে উদ্বুদ্ধ করা। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় এক হাজার মৌবাক্সের মাধ্যমে মধু সংগ্রহ চলছে। এ মৌসুমে প্রায় ৯ হাজার কেজি মধু উৎপাদনের আশা করা হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, মৌমাছি শুধু মধু সংগ্রহই করে না, ফসলের জন্য ক্ষতিকর কীটপতঙ্গ দমন করেও কৃষকদের উৎপাদন বাড়াতে সহায়তা করে।

 

এই বিভাগের আরো খবর