রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ও পানি সমস্যার সমাধানে পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একই সঙ্গে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন, আগামী নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফ করা হবে।
আজ শুক্রবার বিকেলে রাজশাহীর ঐতিহাসিক মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। আজ দুপুরে ২২ বছর পর রাজশাহীতে পা রাখলেন তারেক রহমান। রাজশাহী বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে আসা নেতাকর্মীরা তাকে স্বাগত জানান।
জনসভায় তারেক রহমান রাজশাহী অঞ্চলের উন্নয়ন নিয়ে তার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। বিশেষ করে বরেন্দ্র প্রকল্প, আম সংরক্ষণ, শিক্ষা ও আইটি খাতের উন্নয়ন এবং ফ্যামিলি কার্ড ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে তিনি তার ভাবনার কথা জানান।
রাজশাহী অঞ্চলের কৃষি ও পানি সমস্যার সমাধানে জিয়াউর রহমানের আমলে নেওয়া বরেন্দ্র প্রকল্পের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘শহীদ জিয়ার বরেন্দ্র প্রকল্পের ফলে এই অঞ্চলে খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ হয়েছিল। কিন্তু বিগত ১৬ বছরে এই প্রকল্পকে ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে। আমরা সরকার গঠন করলে বরেন্দ্র প্রকল্প পুনরায় চালু করব এবং খালগুলো খনন করব।’
তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের সমর্থন থাকলে আমরা পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণের কাজে হাত দিতে চাই। এটি হলে রাজশাহী, নাটোর, চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ পুরো অঞ্চলের মানুষের উপকার হবে।’
কৃষকদের ভাগ্য উন্নয়নে বিএনপির পরিকল্পনার কথা জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘কৃষক ভালো থাকলে দেশ ভালো থাকবে। আমরা কৃষকদের জন্য “কৃষি কার্ড” চালু করব, যার মাধ্যমে তারা ব্যাংক ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশকের সুবিধা পাবেন।’
এ সময় তিনি ঘোষণা দেন, ‘আগামী ১২ তারিখে ধানের শীষ বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ করা হবে।’
রাজশাহী অঞ্চলের অর্থনীতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ আম সংরক্ষণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘এখানে আম সংরক্ষণের কোনো হিমাগার নেই। আমাদের পরিকল্পনায় আছে, কীভাবে আম বেশি দিন সংরক্ষণ করা যায়। আমরা এ অঞ্চলে আমের জন্য বিশেষ হিমাগার তৈরি করতে চাই।’
রাজশাহী আইটি পার্কের বর্তমান অবস্থার সমালোচনা করে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘আইটি পার্ক আছে, কিন্তু কাজ নেই। আমরা এটাকে সচল করতে চাই। শিক্ষিত ও আইটি দক্ষ তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে চাই। এ ছাড়া ভোকেশনাল ইনস্টিটিউট গড়ে তুলে তরুণদের কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশে ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা হবে।’
নারীদের স্বাবলম্বী করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তারেক রহমান বলেন, ‘খালেদা জিয়া নারীদের অবৈতনিক শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন। এখন আমরা প্রতিটি মায়ের হাতে “ফ্যামিলি কার্ড” পৌঁছে দিতে চাই। এর মাধ্যমে তারা রাষ্ট্রের কাছ থেকে মাসিক সহায়তা পাবেন, যা দিয়ে সংসারের ধাক্কা সামলে উঠতে পারবেন।’
রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা কমাতে এ অঞ্চলে বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি। তারেক রহমান বলেন, আমরা চাই দেশের মানুষ দেশেই ভালো চিকিৎসা পাক এবং বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হোক।
আগামী নির্বাচনকে গণতন্ত্র রক্ষার লড়াই হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘১২ তারিখের নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে দেশ গণতন্ত্রের পথে যাবে, নাকি অন্য কোনো দিকে। গণতন্ত্রের ভিত্তি মজবুত হলে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমরা শান্তিতে বিশ্বাস করি। ঝগড়া-বিবাদে যেতে চাই না। কোথাও কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটলে অন্তর্বর্তী সরকারকে সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান জানাই। আমরা হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান—সবাই মিলে শান্তিতে বসবাস করতে চাই।’
তিনি বলেন, ‘১৯৭১ সালের স্বাধীনতাযুদ্ধে যখন মুক্তিযোদ্ধারা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন, তখন কেউ দেখেনি কার কী ধর্ম। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট যখন দেশের মানুষ স্বৈরাচারকে বিদায় করতে রাজপথে নেমেছিল, তখনও আমরা দেখিনি কে মুসলিম, কে হিন্দু, কে বৌদ্ধ বা খ্রিষ্টান। আজ দেশ গড়ার সময় এসেছে, গণতন্ত্র রক্ষার সময় এসেছে। আজ আমরা ধর্ম নয়, দেখব ভোটার, আমরা দেখব মানুষ। আমরা দেখব সে বাংলাদেশি। তার সবচেয়ে বড় পরিচয় তিনি বাংলাদেশি, তিনি গণতন্ত্র ও শান্তিতে বিশ্বাসী। যারাই গণতন্ত্র ও শান্তিতে বিশ্বাসী, আমরা তাদের সঙ্গে আছি, তাদেরকে সঙ্গে রাখতে চাই।’
জনসভায় উপস্থিত ধানের শীষের প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে তারেক রহমান ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, ‘১২ তারিখ পর্যন্ত এদের দেখে রাখার দায়িত্ব আপনাদের। আর বিজয়ী হলে ১৩ তারিখ থেকে আপনাদের দেখে রাখার দায়িত্ব এদের।’
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ৭১-এর স্বাধীনতার মতো ২৪-এর গণ–অভ্যুত্থানের অর্জনকেও আমাদের রক্ষা করতে হবে। শহীদদের রক্তের ঋণ শোধ করতে জনগণের শাসন কায়েম করতে হবে।