দলীয় কোন্দল, শক্ত প্রার্থী ও জামায়াতের সক্রিয় প্রচারে রাজশাহীর চার আসনে চ্যালেঞ্জে বিএনপি
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজশাহীর ছয়টি আসনের মধ্যে অন্তত টিতে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে পারেন বিএনপি প্রার্থী।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ভোটারদের মতে রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর), রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর), রাজশাহী-৪ (বাগমারা) এবং রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) – এই তিনটি আসন দলীয় কোন্দল, ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী এবং জামায়াতের শক্ত অবস্থানের কারণে বিএনপির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
অপরদিকে রাজশাহীতে শক্তিশালী অবস্থান থাকার পরও সেই ১৯৮৬ সালের পরে আর জামায়াতে ইসলামী জয়ের মুখ দেখতে পারেনি। পরে ৫ অগাস্ট পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে চার দশক পর জামায়াত আবার নতুন করে হিসাব কষছে। তারা সর্বোচ্চ শক্তি নিয়ে মাঠে প্রচার কাজ চালাচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বিএনপির চেয়েও জামায়াতে ইসলামী প্রচার ও গণসংযোগ বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে বলে সাধারণ ভোটারদের অভিমত।
রাজশাহী সিটি করপোরেশন ও নয়টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ অঞ্চলে বর্তমানে ছয়টি সংসদীয় আসন রয়েছে। ২০০৮ সালে পুনর্গঠনের মাধ্যমে আসন সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে উন্নীত হয়।
অতীত নির্বাচনের পরিসংখ্যান বলছে, ১৯৯১ সালে একটি আসনে আওয়ামী লীগ এবং একটি জাতীয় পার্টি এবং তিনটিতে বিএনপি জয়ী হয়। ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনে সবকটি আসনই পায় বিএনপি।
তবে ২০০৮ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা চার নির্বাচনে রাজশাহীর সব আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। এর আগে ১৯৮৬ সালের নির্বাচনে পাঁচ আসনের মধ্যে তিনটিতে জাতীয় পার্টি, একটি আওয়ামী লীগ ও একটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী জয়ী হয়েছিলেন।
রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনে বিএনপির প্রার্থী দলটির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল শরীফ উদ্দীন। তার প্রতিদ্বন্দ্বী জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। দুজনকেই শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
শরীফ উদ্দীন নতুন মুখ হলেও তিনি প্রয়াত মন্ত্রী ব্যারিস্টার আমিনুল হকের ছোট ভাই। অন্যদিকে, অধ্যাপক মুজিবুর রহমান ১৯৮৬ সালে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন এবং একাধিকবার নির্বাচন করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ফলে এখানে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
রাজশাহী-৩ (পবা-মোহনপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী অ্যাডভোকেট শফিকুল হক মিলন। তার বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী অধ্যাপক আবুল কালাম আজাদ। মিলন এ আসন থেকে দ্বিতীয়বার দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন করছেন। আর জামায়াতের প্রার্থী প্রথম দলীয় মনোনয়ন পেলেও টানা ২৭ বছর ধরে পবার হড়গ্রাম ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। ফলে রাজনীতি, নির্বাচনী অভিজ্ঞতা ও জনপ্রিয়তায় সমানে সমান। ফলে এখানেও হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ডি এম ডি জিয়াউর রহমান জিয়া। তার বিপরীতে জামায়াতের প্রার্থী ডা. আব্দুল বারী সরদার।
জিয়া স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অভিজ্ঞ হলেও ডা. বারী সমাজসেবামূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এলাকায় পরিচিতি ও গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করেছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিভাজন এবং জামায়াত প্রার্থীর ব্যক্তিগত ‘ইমেজের’ কারণে এ আসনেও জমজমাট প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজশাহী-৫ (পুঠিয়া-দুর্গাপুর) আসনে পরিস্থিতি আরও জটিল। এখানে বিএনপির প্রার্থী অধ্যাপক নজরুল ইসলামের পাশাপাশি ‘বিদ্রোহী’ হিসেবে মাঠে আছেন ইসফা খায়রুল হক শিমুল ও প্রবাসী নেতা ব্যারিস্টার রেজাউল করিম।
অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মনজুর রহমানও সক্রিয় প্রচার চালাচ্ছেন। একাধিক প্রভাবশালী প্রার্থীর কারণে এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
অন্য দুইটি আসনের মধ্যে রাজশাহী-২ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সাবেক মেয়র মিজানুর রহমান মিনু এবং রাজশাহী-৬ (বাঘা-চারঘাট) আসনে আবু সাঈদ চাঁদ ‘তুলনামূলক ভালো’ অবস্থানে রয়েছেন।
এ দুইটি আসনে আসনেও জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। রাজশাহী সদরে জামায়াতের প্রার্থী ডা. জাহাঙ্গীর এবং রাজশাহী-৬ আসনে অধ্যক্ষ নাজমুল হক রয়েছেন। এদের মধ্যে ডা. জাহাঙ্গীর ও নাজমুল হক ভোটের মাঠে নতুন।
রাজশাহী মহানগর জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এমাজ উদ্দিন মণ্ডল বলেন, “রাজশাহীর ছয়টি আসনেই আমাদের শক্ত অবস্থান রয়েছে। আমাদের প্রার্থীরা সবাই সৎ ও যোগ্য। সবাই জনপ্রিয় ব্যক্তি। ফলে সব আসনেই আমাদের প্রার্থীরা ভাল করবেন। কারণ মানুষ পরিবর্তন চায়।”
রাজশাহী মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান রিটন বলেন, “রাজশাহী বিএনপির ঘাঁটি। আর বিএনপি থেকে যারা নির্বাচন করছেন তারা সবাই অভিজ্ঞ ও জনপ্রিয় নেতা। ফলে রাজশাহীর ছয়টি আসনে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিএনপির প্রার্থীর প্রার্থীরা জয়লাভ করবেন।