সীমান্তের জীবন মানেই যেন নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই। একদিকে কর্মসংস্থানের সীমিত সুযোগ, অন্যদিকে মাদক ও চোরাচালানের হাতছানি। এমন বাস্তবতায় স্বাভাবিক জীবনের স্বপ্ন দেখছেন রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার মাটিকাটা ইউনিয়নের তরুণ-তরুণীরা। তাঁদের সেই স্বপ্ন পূরণে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)।
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের প্রশিক্ষণ নিয়ে এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্ন দেখছেন সীমান্তের ২০ জন বেকার যুবক-যুবতী। তাঁদের চোখে-মুখে আত্মবিশ্বাস, হাতে দক্ষতা আর মনে ভবিষ্যৎ গড়ার প্রত্যয়।
মরিয়ম বলেন, ‘আমরা এই প্রশিক্ষণে জানতে পেরেছি কীভাবে বিজ্ঞানসম্মতভাবে গবাদিপশু পালন করা যায়। এই জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করার চেষ্টা করব।’
নাইম হোসেনের বাড়িতে রয়েছে তিনটি গরু। এত দিন গরুর রোগবালাই ও চিকিৎসা সম্পর্কে তেমন ধারণা ছিল না তাঁর। প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ হয়েছে।
নাইম বলেন, ‘আমাদের বাড়িতে তিনটি গরু আছে। গরুর রোগবালাই ও চিকিৎসা সম্পর্কে তেমন জানতাম না। প্রশিক্ষণে গরুর খুরা রোগের চিকিৎসা সম্পর্কে জেনেছি এবং তা কাজে লাগিয়ে গরুকে ভালো করেছি। এই প্রশিক্ষণ আমাদের জন্য অনেক কাজে লাগবে।’
নাইমের এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দেয়, দক্ষতা অর্জনের সুযোগ পেলে সীমান্তের তরুণরাও নিজেদের জীবনে পরিবর্তন আনতে পারেন।
ইসমত জাহান একজন শিক্ষার্থী। গবাদিপশু পালন সম্পর্কে আগে তেমন কিছু জানা ছিল না তাঁর। বিজিবির উদ্যোগে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর সেই অজ্ঞতার জায়গা পূরণ হয়েছে নতুন জ্ঞানে।
ইসমত বলেন, ‘আগে গবাদিপশু পালন সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। প্রশিক্ষণ নিয়ে অনেক কিছু জানতে পেরেছি। ভবিষ্যতে আমার একটি খামার তৈরির পরিকল্পনা আছে। প্রশিক্ষণ থেকে শেখা কৌশলগুলো তখন অনেক কাজে লাগবে।’
ইসমতের মতো মরিয়ম খাতুনও দেখছেন সম্ভাবনার নতুন পথ। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে গবাদিপশু পালন, পরিচর্যা ও রোগবালাই সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করেছেন তিনি।
বেকার যুবক-যুবতীদের স্বাবলম্বী করে তুলতে রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি)-এর ব্যবস্থাপনায় এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। গত ২৩ আগস্ট শুরু হয়ে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম। এতে মাটিকাটা ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকার ২০ জন যুবক-যুবতী অংশ নেন।
গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালনের বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। স্বল্প পুঁজি ও সীমিত পরিসরে এসব পালন করে কীভাবে আয় করা যায়, সে বিষয়ে দেওয়া হয় প্রয়োজনীয় জ্ঞান ও ব্যবহারিক দক্ষতা।
বৃহস্পতিবার সকালে মাটিকাটা ইউনিয়ন পরিষদের হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদপত্র বিতরণ অনুষ্ঠান। এতে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী ব্যাটালিয়ন (১ বিজিবি)-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার।
অনুষ্ঠানে প্রেমতলী তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ মাকসুদুর রহমান, বিদিরপুর ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার খন্দকার আব্দুল হাই, রাজাবাড়ি যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষকসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। প্রশিক্ষণ শেষে অংশগ্রহণকারীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় সনদপত্র।
বিজিবি সূত্রে জানা গেছে, সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অসহায় ও দরিদ্র মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে বিজিবি। এরই ধারাবাহিকতায় সীমান্ত কারিগরি ও কর্মসংস্থান প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের আওতায় এ প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়।
প্রশিক্ষণের লক্ষ্য শুধু পশুপালনের দক্ষতা অর্জন নয়; বরং সীমান্তের বেকার তরুণদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা। যাতে তাঁরা স্বল্প পুঁজিতে নিজের বাড়িতেই আয় করার পথ তৈরি করতে পারেন।
সীমান্তবর্তী এলাকায় কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হলে তরুণদের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে মনে করেন বিজিবির কর্মকর্তারা। কর্মমুখী হয়ে উঠলে তাঁরা মাদক ও চোরাচালানের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে থাকতে পারবেন।
রাজশাহী-১ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল রিয়াজ শাহরিয়ার বলেন, ‘এ ধরনের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সীমান্তবর্তী বেকার যুবকদের বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। তাঁরা নিজেদের বাড়িতে স্বল্প পুঁজিতে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি পালন করে আয় করতে পারবেন।’
তিনি বলেন, ‘এতে পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা বৃদ্ধির পাশাপাশি পুষ্টির চাহিদা পূরণেও তাঁরা ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
বিজিবির এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘সীমান্তবর্তী যুবসমাজকে চোরাচালান ও মাদকের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে দূরে রেখে কর্মমুখী ও আত্মনির্ভরশীল করে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণরা পরিবার ও দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবেন।’
সীমান্তের তরুণদের হাতে এখন শুধু প্রশিক্ষণের সনদ নয়, রয়েছে নতুন করে জীবন গড়ার প্রত্যয়। কেউ খামার করার পরিকল্পনা করছেন, কেউ বাড়ির গরু পালনকে আরও লাভজনক করার স্বপ্ন দেখছেন। তাঁদের প্রত্যাশা, শেখা দক্ষতা কাজে লাগিয়ে নিজেরা স্বাবলম্বী হবেন, পরিবারে স্বচ্ছলতা আনবেন।
বিজিবি জানিয়েছে, সীমান্তবর্তী তরুণ প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালনা এবং তাঁদের জীবনমান উন্নয়নে ভবিষ্যতেও এ ধরনের জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সীমান্তের এই তরুণদের স্বপ্ন কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে প্রশিক্ষণের পর তাঁরা কতটা সুযোগ ও সহায়তা পান তার ওপর। তবে শুরুটা হয়েছে—দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে, স্বাবলম্বী হওয়ার প্রত্যয় নিয়ে।